এমভি পারাবত

 


কেবিন থেকে লঞ্চের ডেকে বের হতেই উন্মত্ত বাতাস এসে নাকে মুখে আঘাত করলো। নেশাগ্রস্ত এলোমেলো রাতটা প্রায় শেষের দিকে। বাকিরা দলবেঁধে ডেকের সামনের দিকে গেছে বাকি রাতটুকু ওখানে শুয়ে থাকবে বলে। আমিও ওদিকে যাচ্ছি। হাঁটতে হাঁটতে ভাবি ফেলে আসা সময়টা নিয়ে। গোটা রাতটা আমরা লঞ্চের ছাদে কাটিয়েছি। আধো অন্ধকারে যখন দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির এক অদেখা সৌন্দর্য্য আমায় মোহগ্রস্ত করে তুলেছিল তখন লঞ্চটা যান্ত্রিক শুশুকের মতো পাড়ি দিয়েছে পদ্মা, মেঘনা আর ডাকাতিয়ার মোহনা। এখন সবকিছু কেমন স্বপ্নের মতো মনে হয়, অবাস্তব মনে হয়। 


ডেকের সামনের দিকে আসতেই বুঝলাম এখানের বাতাস আরও হিংস্র, সবকিছু সে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছে অজানা আক্রোশে। বাকিদের দিকে তাকাই, সবাই ডেকের উপর গুটিশুটি শুয়ে আছে। নির্ঘুম রাত পার করে সবার দেহ ক্লান্ত আর অবসন্ন, একজন আরেকজনের উপর হেলান দিয়ে জিরিয়ে নিচ্ছে। আমি লঞ্চের এক কিনারায় গিয়ে দাড়াই। উপরে কালচে আকাশ কেমন ঘোলাটে, ভোর হবার আগে শেষবারের মতো নিজেকে আরেকবার রাতের ঘোমটায় জড়িয়ে ফেলেছে। 


নদী এখানে খুব একটা সংকীর্ণ নয় তবু দিগন্তে গিয়ে সে আকাশকে ছুঁতে পারে না। আমি নিচে তাকাই। পাগলাটে ঢেউ কেটে লঞ্চটা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে একটা সরল রেখায় এগিয়ে যাচ্ছে যেন আর কিছুদূর যেতে পারলেই স্বর্গের দুয়ারে গিয়ে ধাক্কা দিবে। কিন্তু উন্মাদ ঢেউ এটা মানতেই নারাজ, লঞ্চের গায়ে আঁচড় কেটে ফোঁস ফোঁস শব্দ করছে। কালো পানিতে ঘষা খেয়ে সাদা ফেনা নদীর বুকে থেকে থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে, পানি ছলকে উঠে এসে গায়ে লাগছে।  আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকি, কতো সময় পার হয়ে যায় নিরবে, অলক্ষ্যে। 


একসময় পৃথিবীর সব শব্দ যেনো এক অদৃশ্য গহ্বরে মিলিয়ে যায়। শুধু থাকে পানির ছলছল ধ্বনি আর লঞ্চের যান্ত্রিক নিনাদ। আমি রেলিং ধরে চুপচাপ চেয়ে থাকি। অন্ধকার ফুঁড়ে হঠাৎ হঠাৎ দুই একটা লঞ্চ, স্টিমার বের হয়। কিছুদূর তাল মিলিয়ে চলে আবার অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। দূর দিগন্তে একটা ওয়াচ টাওয়ার থেকে আলো দেখা যায়। সবকিছু কেমন অপার্থিব লাগে; এই নদী, এই রাত, এই অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ ভুল করে যাত্রা সব। হলেও হতে পারতো আমার জীবন শহুরে বোকা বাকসে না বন্দী হয়ে এই মাঝ নদীতে মুক্ত। একটা হাহাকার বের হতেই মনে হয় একরাতেই যেনো আমার অনেক কিছু  বদলে গেছে। ক্লান্তি ঠেলে শরীরে অন্যরকম বিচিত্র একটা অনুভূতি। একটা কিছুর সান্নিধ্য পেতে চায় সে। আমি কি প্রেমে পড়েছি? হয় যদি তবে কিসের? 


কিনারা থেকে সরে আসি। কেউ কেউ ঘুমিয়ে পড়েছে ইতোমধ্যে। ওদের দেখে নিষ্পাপ দেবশিশু মনে হয়। আমিও এক পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ি। উপরে তাকিয়ে আকাশটাকে আমার সত্যিই দেবতা ইউরেনাস মনে হয়। অথচ শহরে সে যেন জেলখানায় বন্দী এক আসামী মাত্র কি এক অপরাধে হাজার বছরের সাজা মাথায় নিয়েছে যেন। কয়েক মাইল দূরত্বের পৃথিবীটার কতো পার্থক্য। ভাবি এই একই আকাশ তবে আলপাইনের ধারে কেমন? কিংবা ক্যারিবিয়ান সাগরের উপর? 


দূর্জয়ের পোর্টেবল স্পিকারে চান্দানিয়া গানটা বাজতে থাকে। গানের বিষণ্ণ সুর শেষ রাত্রির ঠান্ডা বাতাসে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। দিগন্তে তখন আলোর রেখা দেখা দিচ্ছে, কালচে মেঘ সরে গিয়ে নীল আকাশ উকিঝুঁকি মারছে। কিছু পরেই শেষ হবে এই যাত্রা। আমি আবেশে চোখ মুদি, জীবন নতুন একটা দিকে মোড় নিচ্ছে আবার। অনুভব করি বিশাল একটা পরিবর্তন আসছে কোথাও। হবে কি এবার আমার ঠাঁই মোড় পেড়িয়ে অশ্বত্থ গাছটির তলায়?


(২৬ মার্চ ২০২২)


Comments